আমেরিকায় থ্যাংকসগিভিং ডে

আমেরিকায় থ্যাংকসগিভিং ডে

নভেম্বর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার হচ্ছে থ্যাংকস গিভিং ডে। পুরো আমেরিকায় এই দিনটি ঘটা করে পালন করা হয়ে থাকে। টার্কি খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। থ্যাংকস গিভিং ডের পরের দিন হচ্ছে ব্ল্যাক ফ্রাইডে। এবার সে দিনটি ছিল ২৭ নভেম্বর, শুক্রবার। এই দিনটিতে আমেরিকানরা শপিংয়ের জন্য শপিং সেন্টারগুলোয় সাধারণত হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামগ্রী বিক্রি হয়ে থাকে এই দিনে। কেনার জন্য কিছু না থাকলেও এই দিন অনেকে বিনা কারণে মার্কেটে গিয়ে ঢুঁ দিয়ে আসে যদি কিছু সস্তায় সেলে বা ডিসকাউন্টে থাকে সেই মিস কেনইবা করবে, সে আশায়। অথচ এবার সেই ব্ল্যাক ফ্রাইডে হলো ঠিকই, কিন্তু মানুষ যে হারে অতীতের ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে মার্কেটে এসে মিডনাইট থেকে লাইন দিয়ে থেকে শপিং করত, সেই হারে হুমড়ি খেয়ে আর পড়ল না। কারণ, বাদ সেধেছিল করোনাভাইরাস। 



এ ভাইরাসের কারণে এবার আমেরিকানরা থ্যাংকস গিভিং ডেতে পরিবার–পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইহুল্লোড় করে যেমন টার্কি খাওয়ার আনন্দঘন পরিপূর্ণ স্বাদ নিতে পারেনি, ঠিক তেমনি ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে শপিং সেন্টারে যেতেও অনেকটা শঙ্কিত ছিল তাঁরা। অনেকেই অনলাইন বেজড শপিংয়ের ওপরে নির্ভরশীল ছিল এবার।


করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ আমেরিকার আকাশ ও বাতাসকে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ থাকতে দেয়নি। তাই ছয় ফুট দূরত্ব মেনে চলা, মুখে মাস্ক পরা, বাহির থেকে এসে হাত–মুখ ধৌত করা এবার যেন অনেকেরই প্রতিদিনের রুটিনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও থ্যাংকস গিভিং ডে উপলক্ষে সিডিসির রিসেন্ট সতর্কতা নির্দেশ এবং এনআইএইচ ডিরেক্টর ড. ফাউসি আমেরিকানদের প্রতি এবার বিনীত অনুরোধও করেছিলেন, তাঁরা যেন একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত থ্যাংকস গিভিং ব্রেকে ট্রাভেল না করেন, জনসমাগম এভয়েড করেন। এসব কারণে করোনাভাইরাসের প্রভাবে এবারকার থ্যাংকস গিভিং বা ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে আগের মতো সেই চার্ম তেমন দেখা যায়নি।



এটা বলতে হয়, দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যেও আমেরিকানদের কিছু কিছু ভালো কালচার শরীরের সঙ্গে মেখে গেছে। বিশেষ করে আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও থ্যাংকস গিভিং ডে বেশ ধুমধাম করে আয়োজন করে থাকে। পরিবার ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটায়। ব্ল্যাক ফ্রাইডে উপলক্ষে ঘরের নানা সামগ্রী ডিসকাউন্টে কেনার জন্য মার্কেটে যাওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে। টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, সোফা, ডাইনিংয়ের টেবিল–চেয়ার, সেলফোন, রাইস কুকার থেকে শুরু করে ঘরের যা কিছু লাগে, এই দিনটি সাধারণত বড় আকারের কেনাকাটার জন্যই পূর্বনির্ধারিত করা থাকে। ব্ল্যাক ফ্রাইডেকে তাই শপিংডেও বলা যেতে পারে।



করোনাভাইরাসের কারণে না হোক থ্যাংকস গিভিং উদ্‌যাপন, না হোক ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে শপিং না করার হইহুল্লোড়, কিন্তু তাই বলে দীর্ঘদিন ক্লোজড সার্কেলের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে না, তা কি করে হয়! বাঙালির মন বলতে কথা। একের সঙ্গে অপরের দেখা কিছুদিন না হলেই মন যেন আনচান করে ওঠে। বিশেষ করে ওয়ারা ভাইয়ের মতো ইন্সপাইরেশনাল বড় ভাই যখন আশপাশে থাকে, ছোট ভাইদের বন্ধুদের মতো আপন করে নেয় এবং উদ্যোগী হয়ে একত্র হওয়ার রসদ জোগায়, তখন দূরের কোনো ঘরের কোনায় একাকী বসে বিরহের গান শোনা কি আর শোভা পায়? নিশ্চয় না।


তাই তো ওয়ারা ভাইয়ের উদ্যোগেই হলো এক তড়িৎ আয়োজন। ঘর থেকে বাইরে, মার্কেটের জনচাপ থেকে দূরে, নিরিবিলি এক পরিবেশে, চার্লস রিভারের পাদদেশে, এমআইটি ক্যাম্পাসে, এক বৈকালিক আড্ডা। সেখানেই আমরা একত্র হলাম। এখানে বলে রাখি, শ্রদ্ধেয় ওয়ারা ভাই তথা ড. খায়রুল ওয়ারা হচ্ছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সায়েন্টিস্ট।


ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে এমনিতেই এমআইটি ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে। তার ওপর কোভিড-১৯–এর কারণে ক্যাম্পাস যেন জনশূন্য। ক্যাম্পাসে লকডাউন চলছে। যেহেতু মানুষজন নেই, তাই ক্যাম্পাসকে করোনাভাইরাসমুক্ত ধরে নেওয়া যেতে পারে। এখানে কয়েকজন বন্ধুর মিলিত হওয়ার আইডিয়াটা তাই একেবারেই মন্দ নয়। তদুপরি চার্লস রিভারের মৃদু হাওয়া ভারী মনকেও খানিকটা হালকা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বৈকি!


পাঠকদের জন্য বলে রাখি, বিশ্ববিখ্যাত দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইটি (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজি) বোস্টন শহরে। শুধু তা–ই নয়, বোস্টন শহরের বুক চিরে যে নদীটি এপার–ওপার হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে মিশে গেছে, তার নাম চার্লস রিভার। এই নদীর সৌন্দর্য অপরূপ। পানির হালকা প্রবাহ ও কলকল শব্দ মনকে মাতিয়ে দেয়। রাত্রে আরও ভালো লাগে। চাঁদনি রাত হলে তো কথায় নেই। অজানা কবিও হয়তো কবিতা লিখে ফেলবেন। চলন্ত গাড়ির ছায়া পানিতে পড়ে। বোস্টন ডাউনটাউনের উঁচু উঁচু অট্টালিকার প্রতিচ্ছবি যেন হেলে পড়েছে নদীর পানিতে। শরীরচর্চাকারীরা স্কিনটাইট ট্রাউজার পরে নদীর পাড়ে মাইলের পর মাইল ছুটে চলেছে দেহের মেদ কমাতে অথবা মেদই যেন ছুঁতে পারছে না তাদের দেহকে। বাইকাররা চলছে ছুটে বাতাসের গতিতে। কুকুর যাদের নিত্যসঙ্গী, তারাও কুকুরকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়াচ্ছে আপন গতিতে। নদীর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে বোস্টন ও কেমব্রিজ শহরের মনোরম দৃশ্য দেখার দারুণ এক অনুভূতি মনকে টেনে আনে এখানে তাই বারবার। এমন পরিবেশের এক নয়নাভিরাম নদীর পারে বৈকালিক আড্ডা দিতে কার না মন চায়?


 ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে চার্লস রিভারের পাশেই আড্ডায় বসেছিলেন বাঙালিরা

ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে চার্লস রিভারের পাশেই আড্ডায় বসেছিলেন বাঙালিরা ছবি: সংগৃহীত

সেই আড্ডায় যদি থাকে পরিবারের কাছের মানুষ, ক্লোজড ফ্রেন্ডরা, তাহলে তো কথায় নেই। তাই তো ওয়ারা ভাইয়ের ফোনকলের যথার্থতা প্রমাণ করে ছাড়লাম আমরা। কয়েকজন মিলে দ্রুতগতিতে এসে হাজির হলাম চার্লস রিভারের সন্নিকটে, এমআইটি ক্যাম্পাস ঘেঁষে। বন্ধু ফরিদুর রহমান মিলটন ও তার পরিবার, রসায়নের ছোট ভাই কামরুল হাসান শুভ্র ও তার পরিবার, বন্ধু জাকারিয়া খন্দকার ও তার পরিবার, আমার ও ওয়ারা ভাইয়ের পরিবার মিলে ২০ থেকে ২৫ জন শামিল হলাম এক বৈকালিক আড্ডায়। মিস করেছি আড্ডাবাজ আরও কয়েকজনকে। করোনাভাইরাসের ইফেক্টে পড়ে থাকা এমআইটি ক্যাম্পাসটি আমাদের ছেলেমেয়েদের পদচারণে যেন সেদিন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল।


আমেরিকায় করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়েছিল গত ২১ জানুয়ারি থেকে। সেই থেকে কখনোবা ঘরবন্দী, কখনোবা বাইরে বেরোলেই নয়, আবার কখনো অফিসের ডাকে সাড়া দেওয়া ছাড়া বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে চুপিসারে বাড়ির বেক ইয়ার্ডে একটু–আধটু দেখা–সাক্ষাৎ হলেও তা যেন মনকে ভরে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই এমআইটিসংলগ্ন চার্লস রিভারের পাদদেশে ব্ল্যাক ফ্রাইডের বৈকালিক এই আড্ডা মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও যেন প্রেশার রিলিজ হওয়ার জন্য এক সাক্ষাৎ।



মিদুরি (হার্ভার্ড স্টুডেন্ট, তারপর হার্ভার্ড রিসার্চার), রিনভি (হার্ভার্ড রিসার্চার), রাকীন (স্টুডেন্ট অব দ্যা ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, আরবানা শ্যাম্পেইন), জুনকো (স্টুডেন্ট অব দ্যা ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস, এমহাস্ট), বর্ণালি (টেনথ গ্রেডার), সাহেল (নাইনথ গ্রেডার), শপ্ত (এইট গ্রেডার), বর্ণিল (সেভেনথ গ্রেডার), সামি (সিক্স গ্রেডার), সেজা (থার্ড গ্রেডার)। তাঁদেরকে একসঙ্গে কাছে পেয়ে আমরা প্যারেন্টরা ছিলাম মুগ্ধ, অভিভূত। আমাদের ছেলেমেয়েরা মুখে মাস্ক পরে দল বেঁধে সামাজিক দূরত্ব মেনে এমআইটি ক্যাম্পাসের আনাচকানাচে নিজেরাই ঘুরতে গেল। মুহূর্তেই বিশ্বের স্বনামধন্য এমআইটি ক্যাম্পাসটিকে বাঙালি দোয়েল পাখিদের এক বিচরণক্ষেত্র বলে মনে হতে লাগল।


আর ভাবিরা? মুখে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় কেউ কেউ ক্লিক ক্লিক শব্দে ক্যামেরার মধ্যে আবদ্ধ হতে লাগল। পেছনে চার্লস রিভারের নীরব জল, দূরের ব্যাকগ্রাউন্ডে বোস্টন ডাউনটাউনের উচুতর অট্টালিকা। আর আমরা ছেলেরা? রিভারের পাশ বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন শেষতক কবে আসবে কবে আসবে আমাদের হাতে বলতে বলতেই বিকেল কাটিয়ে দিলাম।


এমনই এক সময় ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েরা হাঁটা শুরু করে দিল এমআইটি ক্যাম্পাসের সন্নিকটে রেস্টুরেন্ট অভিমুখে। সেখান থেকে এল পরিবারকেন্দ্রিক বেছে বেছে চাহিদামাফিক খাবার। জাপানিজ সুসি, টেম্পুরা কারি, টেম্পুরা ভেজিটেবল কারি, আরও হরেক জাপানিজ টাইপ ফুড।


ভূরিভোজন শেষে ঘরে আবার ফিরে আসা। সঙ্গে বৈকালিক এক আড্ডার সুখস্মৃতি নিয়ে।


লেখক: বোস্টনের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন :