পিক আওয়ারে ভাড়া বেশি

পিক আওয়ারে ভাড়া বেশি

নাজমুল হোসেন (২৫) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ থেকে স্নাতক পাস করেছেন। গত সপ্তাহে সকাল ৯টায় একটি চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে গুলশান গিয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে মোবাইল ফোনের অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা কম্পানি উবারের গাড়ি ডেকেছিলেন তিনি। গুলশান ২ নম্বর পর্যন্ত উবার অ্যাপে ভাড়া দেখাল ১৬৬ টাকা। বেশি মনে হলেও তিনি সেই ভাড়াতেই গন্তব্যে যান। নাজমুল বলছিলেন, বিমানবন্দর থেকে উবারে গুলশান ২ নম্বরে তিনি আগেও গিয়েছেন। ১০০-১১০ টাকার বেশি ভাড়া আসেনি।

ঈশাবা সাঈদ (২৪) বেসরকারি কম্পানি মেটলাইফ ইনস্যুরেন্সে চাকরি করেন। গত ২৫ নভেম্বর বিকেলে মতিঝিল থেকে যমুনা ফিউচার পার্কে যাওয়ার প্রয়োজন হলে উবারে যাবেন বলে ঠিক করেন। দুপুর ২টা ৫ মিনিটে মতিঝিল আলিকো বিল্ডিং থেকে যমুনা ফিউচার পার্কে উবার অ্যাপে ভাড়া দেখাচ্ছিল ৪৬৯ টাকা। অফিস শেষে বিকেল ৫টা ১ মিনিটে উবার অ্যাপে কল করলে ভাড়া দেখায় ৫৯৩ টাকা। অর্থাৎ বিকেলে ভাড়া বেড়ে গেল ১২৪ টাকা। বেশি মনে হওয়ায় তিনি ৩০০ টাকার মধ্যে অটোরিকশা ভাড়া করে যমুনা ফিউচার পার্কে যান। রাতে ফেরার সময় আবার উবারে কল করলে ভাড়া দেখায় ৪৪৩ টাকা। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে ভাড়া ওঠানামা করছিল।

রাইড শেয়ারিং সেবার কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,  কোথাও যাওয়ার জন্য ভাড়া কত আসে তা অ্যাপে দেখার পর যখন ৫-১০ মিনিট পর রাইড কনফার্ম করা হয় তখন ভাড়া দেখানো হয় ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি।

গত এক সপ্তাহ ধরে দিনের পিক আওয়ার ও অন্যান্য সময়ে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা কম্পানি উবার ও পাঠাওয়ের ভাড়ার ওপর নজর রাখা হয়। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক পর্যন্ত উবার গাড়িতে ১৯ নভেম্বর সকাল ১০টা ১২ মিনিটে ভাড়া ওঠে ৪৬১ টাকা, বিকেল ৫টায় ভাড়া ওঠে ৪৯২ টাকা। ২১ নভেম্বর সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে ভাড়া ৩৩৭ টাকা দেখালেও বিকেল ৫টা ৩৯মিনিটে দেখায় ৩৭৫ টাকা। এভাবে ২২ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে ৬১২ টাকা এবং বিকেলে ৪৮২ টাকা। ২৩ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে ৪১৮ টাকা ও বিকেলে ৫৩৭ টাকা।

২৫ নভেম্বর রাইড শেয়ারিং কম্পানি পাঠাওয়ের গাড়ির ভাড়ার ওপর নজর রাখা হয়। সময়ভেদে ভাড়ার তারতম্য না হলেও বিভিন্ন সময় পাঠাও এর গ্রাহক ভাড়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন।

সেজুতি সাবিরা (২৩) একটি বেসরকারি কম্পানিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ২৫ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থেকে তেজগাঁও যাওয়ার জন্য পাঠাও কল করেন। গাড়িটি আরেকটি গাড়িতে কল ফরওয়ার্ড করে দেয়। এভাবে একাধিকবার কল ফরওয়ার্ড করায় তিনি শেষ পর্যন্ত যাত্রা বাতিল করে দেন। সেজুতি বলেন, ‘ট্রিপ বাতিল না করলে সময় আরো নষ্ট হতো। কিন্তু ট্রিপ বাতিল করায় এখন পরের ট্রিপের ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ৩০ টাকা যোগ করে দেওয়া হবে। বিড়ম্বনার ক্ষেত্রে উবারের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, যানজটের কারণে দেরি হলে তাঁর চার্জ কেটে রাখা হয়। এতে করে অ্যাপে ভাড়া ২৫০ টাকা দেখালেও তাঁকে গন্তব্যে নেমে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪৯৯ টাকা।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অনুমোদন পাওয়া কম্পানিগুলো হচ্ছে উবার বাংলাদেশ লিমিটেড, পাঠাও লিমিটেড, পিকমি লিমিটেড, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম লিমিটেড, ওভাই সলিশনস লিমিটেড, চালডাল লিমিটেড, ইজিয়ার টেকনোলজিস লিমিটেড, আকাশ টেকনোলজি, সহজ লিমিটেড, বাডি লিমিটেড ও আকিজ অনলাইন লিমিটেড।

গণপরিবহন সংকটের কারণে ২০১৬ সাল থেকে রাইড শেয়ারিং সেবা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে রাইড শেয়ারিং কম্পানিগুলোকে বিআরটিএর রাইড শেয়ারিং নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী এই পরিষেবার আওতায় আনা হয়। ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন ২০১০ অনুযায়ী, অন্য সব গাড়ির জন্য নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এই রাইড শেয়ারিং সেবার খরচ বেশি হতে পারবে না।

পাঠাও লিমিটেডের হেড অফ মার্কেটিং সায়েদা নাবিলা মাহাবুব বলেন, পিক আওয়ারে গাড়ির চাহিদা বেশি থাকায় ভাড়া বেশি আসে। যেহেতু গাড়ির সংখ্যা কম, আবার পিক আওয়ারে চাহিদা বেশি তাই ভাড়া বেশি ওঠে। তিনি আরো বলেন, ‘যত বেশি রিকয়েস্ট (অনুরোধ) থাকবে, ভাড়ার পরিমাণও তত বাড়তে থাকে।’

কিন্তু পাঠাওয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাইড শেয়ারিং অ্যাপের এলগরিদম এভাবেই করা যেন চাহিদার সময় ভাড়া বেশি ওঠে। অ্যাপের সব কার্যক্রম কম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি আরো বলেন, পিক আওয়ারে ভাড়া মনিটরিং করার জন্য বিআরটিএর কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিসগুলোতে বিআরটিএর সঠিক মনিটরিংয়ের অভাব আছে। ফলে এই সার্ভিসগুলো আদৌ তাদের সব কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করছে কি না, সেটার কোনো তদারকি নেই। বিআরটিএর নিবিড় মনিটরিং ছাড়া রাইড শেয়ারিং ভাড়া কিংবা অন্যান্য সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।’

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, নীতিমালা ভঙ্গ করলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন :