বেশিরভাগ টিকা ধনী দেশগুলো কিনে নিচ্ছে

বেশিরভাগ টিকা ধনী দেশগুলো কিনে নিচ্ছে

মানবদেহে করোনা সংক্রমণের এক বছরের মাথায় ভাইরাসটি ঠেকাতে বেশ কয়েকটি দেশে টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এক বছরের মধ্যে সবার টিকা নিশ্চিতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে উন্নত দেশের সরকারগুলো। তবে পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স নামের একটি জোট উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বিশ্বের ৭০টি গরিব দেশের প্রতি ১০ জনের ৯ জনই আগামী বছর করোনাভাইরাসের টিকা না-ও পেতে পারে। কারণ বেশির ভাগ টিকাই কিনে নিচ্ছে পশ্চিমা ধনী দেশগুলো।

এদিকে করোনাভাইরাস নিয়ে তদন্তে আগামী মাসে চীনের উহানে যাচ্ছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) বিজ্ঞানীরা। গত বছরের শেষ দিকে সেখানেই প্রথম মানবদেহে করোনা শনাক্তের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সবার আগের টিকা কর্মসূচি শুরু করা যুক্তরাজ্যে আগামী বছর শেষেও অর্ধেক মানুষ টিকা পাবে না। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে কানাডার সব মানুষকে টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি বলেছেন, আগামী বছরের শেষে দেশটির জনগণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে প্রথম সপ্তাহে (৮-১৫ ডিসেম্বর) মোট এক লাখ ৩৭ হাজার ৮৯৭ জনকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ মন্ত্রী নাদিম জাহাই এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে টিকা প্রদানের পরিধি বাড়ানো হবে। দেশটির পরিসংখ্যান কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছর শেষে ইংল্যান্ডের সাড়ে পাঁচ কোটির মধ্যে আড়াই কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন করে ৪৬ হাজার কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন পড়বে।

আর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি বলেছেন, ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ মানুষের টিকা নিশ্চিত করা গেলে জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হবে। তবে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের টিকা নিশ্চিতে আগামী বছর লেগে যেতে পারে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের টিকাবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা ড. মোনসেফ স্লাউয়ি বলেছেন, আগামী বছরের মাঝামাঝিতে বেশির ভাগ আমেরিকান যাতে টিকা পায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ফাইজারের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মডার্নার টিকার অনুমোদনের বিষয়ে বৈঠক করেছে দেশটির খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। শুরুতে স্বাস্থ্যকর্মী ও  বয়োজ্যেষ্ঠদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগামী মার্চ-এপ্রিল নাগাদ সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকার প্রয়োগ শুরু হবে।

সিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবলিক হেলথ এজেন্সি অব কানাডার হিসাবে, দেশটির সব নাগরিক আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ টিকা নিতে পারবে। দেশটি চাহিদার তুলনায় পাঁচ গুণ টিকার ক্রয়াদেশ দিয়েছে।

এদিকে তহবিলসংকট, সরবরাহ ঝুঁকি এবং চুক্তিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিশ্বের গরিব দেশগুলোতে ‘কোভ্যাক্স’ প্রগ্রামের টিকা বিতরণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার প্রবল ঝুঁকি বিরাজ করছে বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ডাব্লিউএইচও এই প্রগ্রামের আওতায় ২০২১ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বের ৯১টি দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশকে ২০০ কোটি ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই উদ্যোগের সহযোগী গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স ‘জিএভিআই’ বোর্ড থেকে দেওয়া অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘একটি সফল কোভ্যাক্স অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।’

উহান যাচ্ছেন ডাব্লিউএইচওর বিজ্ঞানীরা

করোনাভাইরাসের উৎস সন্ধানে আগামী মাসে চীনের উহান শহরে যাচ্ছেন ডাব্লিউএইচওর একদল বিজ্ঞানী। গত বছরের শেষ দিকে সেখানেই প্রথম মানবদেহে করোনা শনাক্তের ঘটনা ঘটে। বিবিসি জানিয়েছে, ভাইরাসটির আবির্ভাব নিয়ে পৃথক তদন্তে অনীহা ছিল বেইজিংয়ের। সে কারণে শহরটিতে প্রবেশাধিকার পেতে ডাব্লিউএইচওকে বেশ কয়েক মাস দর-কষাকষি করতে হয়েছে। উহানের একটি বন্য প্রাণীর বাজার থেকে ভাইরাসটি মানবদেহে ছড়ায় বলে ধারণা করা হলেও এখনো এর উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা।

উহানে ডাব্লিউএইচওর পাঠানো ১০ বিজ্ঞানী মূলত ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর উপায় খুঁজতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন দলটির সদস্য একজন জীববিজ্ঞানী। জার্মানির ফাবিয়ান লিনডার্টজ বলেছেন, ‘প্রকৃত অর্থে দায়ী দেশ খুঁজে বের করার জন্য নয়, কী ঘটেছিল তা বোঝার চেষ্টা করতে দলটি সেখানে যাচ্ছে। যদি কিছু তথ্য পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আমরা ঝুঁকি কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারি।’

যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড

বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। গত এক দিনে প্রাণহানিতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে দেশটিতে। এতে করে মৃতের সংখ্যা তিন লাখ ১৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নতুন করে করোনার শিকার হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মার্কিন।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাবে, ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৬ জন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এতে করে সংক্রমিতের সংখ্যা বেড়ে এক কোটি ৭২ লাখ ৯২ হাজার ৬১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে প্রাণ হারিয়েছে তিন হাজার ৫৩৮ জন। এ নিয়ে প্রাণহানি বেড়ে তিন লাখ ১৪ হাজার ৬২৯ জনে ঠেকেছে। অন্যদিকে সংক্রমণের তুলনায় কম হলেও গত ২৪ ঘণ্টায় করোনামুক্ত হয়েছে এক লাখ ৬২ হাজার ভুক্তভোগী। এতে সুস্থতার সংখ্যা এক কোটি এক লাখ ৭০ হাজার ৭৩৫ জনে পৌঁছেছে।

টিকা নিচ্ছেন বাইডেন ও পেন্স

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী সপ্তাহে করোনাভাইরাসের টিকা নেবেন বলে জানিয়েছেন বাইডেনের ট্রানজিশন টিমের কর্মকর্তারা। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স আজ শুক্রবার টিকা নেবেন বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে। টিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, তা দূর করে তাদের আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাইডেন ও পেন্স, উভয়েই জনসমক্ষে টিকা নেবেন।

বিশ্ব পরিস্থিতি

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাবে, গতকাল পর্যন্ত বিশ্বের ২১৮টি দেশ-অঞ্চলে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সাত কোটি ৫২ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গত বুধবার রেকর্ড সোয়া সাত লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে সেরে উঠেছে পাঁচ কোটি ২৮ লাখ রোগী। আর প্রাণ হারিয়েছে ১৬ লাখ ৬৪ হাজার জন।

আপনার মতামত লিখুন :