‌‘বৈশা‌খে ইলিশ নয়’

‌‘বৈশা‌খে ইলিশ নয়’

ব্যাংক‌কে ব‌সে নানা মাছ খা‌চ্ছি আর আমার ম‌নে পড়‌ছে ইলিশের কথা। ইলিশ আমার প্রচণ্ড পছন্দের মাছ । কতোটা পছ‌ন্দের সেটা যারা আমাকে চেনেন তারা খুব ভালো করে জানেন। প‌কে‌টের সব টাকা দি‌য়ে ইলিশ কি‌নে শূন্য প‌কে‌টে ঘ‌রে ফেরা মানুষ আমি।

ইলিশ ছাড়া আর কোনো খাবা‌রের প্র‌তি আমার মোহ নেই। বেহেশতে গেলে প্রথমেই ‌আমি ইলিশ অর্ডার করব। ‌কিন্ত সেই ‌আমি বৈশা‌খে ইলিশ খাই না।

বর্জ‌নের কারণটা খুব সাধারণ। প্রথমত, পান্তা ইলিশের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের কোনো সম্পর্কই নেই। আর দ্বিতীয়ত, নভেম্বর থেকে মে মাস এই সময়টা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। কারণ তখন ইলিশ জাটকা থা‌কে।

আজ‌কে এই কথাগুলা বলার কারণ আবারও বাঙা‌লির প্রা‌নের উৎসব নববর্ষ আস‌ছে। নববর্ষ উৎযাপ‌নের প্রস্তু‌তিও শুরু হ‌য়ে‌ছে চারপা‌শে। আমি গত ক‌য়েক বছর ধ‌রে ধারাবা‌হিকভা‌বে নববর্ষ‌ে ইলিশ বর্জ‌নের কথা ব‌লে আস‌ছি।

‌আমি জা‌নি স‌চেতন অনেক বাঙা‌লি এখন নববর্ষ‌ে ইলিশ পান্তার ব‌ি‌রুদ্ধ‌ে স‌োচ্চার। কিন্তু তারপরও দেখ‌ছি বৈশাখ‌কে সাম‌নে রে‌খে সুপার স্টোরগু‌লো‌তে ইলিশ আস‌ছে। অনলাইন থে‌কে শুরু ক‌রে পাড়ায় পাড়ায় ফে‌রিওয়ালারা জাটকা নিয়ে ঘুর‌ছে - ইলিশ ইলিশ হাক দি‌য়ে। অনেকে এখ‌নও বৈশাখ মা‌নেই ইলিশ বু‌ঝে।

অন্যকে উপ‌দেশ দেয়ার আগে নিজে‌ সেটা মানা দরকার। আর সে কার‌ণে আমার ম‌তো ইলিশভক্ত মানুষ ২০১০ সাল থেকে পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাই না। আর পান্তা ইলিশ আমি কোন‌দিনও খাইনি। শুধু নিজে নয় আমি আমার বন্ধুবান্ধবদেরও এখন ইলিশ বর্জ‌নের অনুরোধ করি এই সময়। কারণ ইলিশ সংরক্ষণ।

গত ক‌য়েক বছর ধ‌রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও প‌হেলা বৈশা‌খে ইলিশ বর্জ‌নের আহ্বান জা‌নি‌য়ে‌ছি‌লেন। বিষয়টি সারা‌দে‌শে ইলিশ সংরক্ষ‌ণের জন্য একটা বড় অগ্রগ‌তি ছিল।

কারণ ওই ঘোষণার পর রাষ্ট্রীয়ভা‌বে যেমন ইলিশ খাওয়া বন্ধ হ‌য়ে‌ছিল তেম‌নি সরকা‌রি দ‌লের নেতাকর্মীরাও প্রকা‌শ্যে ইলিশ বর্জন ক‌রে‌ছি‌লেন।

ত‌বে দুঃখের বিষয় হ‌লো এখ‌নও অনেককে বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার প‌ক্ষে কথা বল‌তে দে‌খি। আমার ম‌নে হয় এই সংকীর্ণতা দূর করা উচিত। বরং কিছু জায়গায় রাজ‌নৈ‌তিক ঐক্যমত জরুরী দে‌শের স্বা‌র্থে। ইলিশ তেম‌নি একটা বিষয়।

আপনাদের কী ম‌নে আছে? তিন বছর আগে জুলাই, আগস্ট ও ‌সেপ্টেম্ব‌র মা‌সে ইলি‌শের মৌসু‌মে বাঙা‌লির হাটবাজার, রান্নাঘর সব ইলি‌শে ভ‌রে গি‌য়ে‌ছিল এবং খুব সস্তায় আমরা ইলিশ খে‌তে পে‌রে‌ছিলাম। এই প্রাচু‌র্যের একটা বড় কারণ বৈশা‌খে বিপুল সংখ্যক মানু‌ষের ইলিশ বর্জন।

লেখক ও গবেষক প্রিয় সৈয়দ আবুল মকসুদ ভাই বছর দু‌য়েক আগে, প‌হেলা বৈশা‌খের আগে একটি কলা‌মে লি‌খে‌ছি‌লেন, আমাদের চৌদ্দপুরুষ কোনো দিন শোনেনি যে বাংলা নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে মাটির সানকিতে পান্তাভাত খেতে হয়। গ্রামীণ গরিবদের সঙ্গে এটি একটি পরিহাস।'

বাস্তবতা হলো আশির দশকের প্রথম দিকে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে কোনো কোনো কোল্ড স্টোরেজের মালিক তাদের মজুত করা ইলিশ বেশি দামে বাজারে ছাড়ার মতলবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কের মাঝের সড়কে পান্তা-ইলিশের প্রবর্তন করেন।

এরপর হঠাৎ করে দেখা গেল দামি গাড়ি নিয়ে বিত্তবানেরা লাইন ধরে পান্তা-ইলিশ খাচ্ছেন সকালবেলা। সাধারণ মধ্যবিত্তের একটি বিচার-বিবেচনাবর্জিত অংশও ওই লাইনে গিয়ে সানকি হাতে দাঁড়িয়ে গেল। বাঙালি সংস্কৃতির নামে বাঙালির চিরকালের সংস্কৃতির ওপর এমন আঘাত হানা হলেও মাছ ব্যবসায়ীদের কল্যাণে প্রথাটি টিকে আছে এতো‌দিন।

অর্থনৈতিক দিক থেকে পান্তা-ইলিশ যে কত বড় আত্মঘাতী কর্ম তা নির্বোধ ছাড়া প্রত্যেকেই বুঝ‌বে। এই পান্তা-ইলিশের কারণে জাটকা ধরায় শতকোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পথ যে রুদ্ধ হয়েছে তা-ই নয়, দেশের মানুষও ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।

কাজেই চলুন আমরা আমাদের ইলিশ বাঁচাই। আমরা য‌দি এই সময়টা ইলিশ না খাই ত‌বে প্রচুর জাটকা ধরা বেঁ‌চে যা‌বে। কেউ কেউ বল‌তে পা‌রেন ফ্রি‌জে থাকা মাছ খে‌তে কী সমস্যা? তা‌দের ব‌লি, আমরা এই সময় ইলিশ খাওয়া বন্ধ রাখ‌লে সাম‌নে এই সময় ইলিশ ধরা ও বি‌ক্রি কমে যা‌বে।

আবারও ব‌লি বৈশা‌খের সঙ্গে ইলি‌শের কোনো সম্পর্ক নেই। আপনার আমার একটু সচেতনতা আর জিহ্বার নিয়ন্ত্রণই পারে দেশের ইলিশ রক্ষা কর‌তে। কা‌জেই চলুন সবাই প‌হেলা বৈশা‌খে ইলিশ বর্জন ক‌রি। মৌসু‌মে ইলিশের প্রাচুর্য্য গ‌ড়ি। সবাইকে ইলিশমুক্ত অগ্রিম বৈশা‌খি শু‌ভেচ্ছা। শুভ সকাল বাংলা‌দেশ।

আপনার মতামত লিখুন :